নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করলেও ব্যবসায়ী মহলের প্রতিক্রিয়ায় প্রশংসার পাশাপাশি সামনে এসেছে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সংকট নিয়ে নানা উদ্বেগ। বিশেষ করে চট্টগ্রামের তিনটি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন নিয়েই তাদের বড় প্রশ্ন।

যদিও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব বলা হয়েছে, কিন্তু বক্তব্যের ভেতরে বারবার উঠে এসেছে এমন সব শর্ত ও দাবি-যা ইঙ্গিত দিচ্ছে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো কাটেনি।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বড়, কিন্তু বাস্তবায়নের পথ অনিশ্চিত : প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার (সিএমসিসিআই) সভাপতি খলিলুর রহমান সরাসরি বলেছেন-এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আগে রাজস্ব ব্যবস্থায় সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

সংগঠনটির মতে, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও কর ব্যবস্থার দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য কাগজে থাকলেও বাস্তবে অর্জন কঠিন হবে। একইসঙ্গে বাজেটে কিছু পণ্য ও সেবায় ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।

অর্থাৎ, রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে যদি বাজারে মূল্যচাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে সেটি ভোক্তা ব্যয় কমিয়ে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতি মন্থর করতে পারে-এমন আশঙ্কাও পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে।

ব্যাংকিং খাত নিয়ে ব্যবসায়ীদের অস্বস্তি : মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রতিক্রিয়ায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ। সংগঠনটি ব্যাংকগুলোকে ‘প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার’ দাবি জানিয়েছে।

এ ধরনের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, ব্যবসায়ী সমাজের একাংশ বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতের কার্যকারিতা নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছে। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে সুশাসন ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

কাঁচামাল, কর ও অর্থায়নে এখনো অসন্তুষ্ট শিল্পখাত : চিটাগাং চেম্বার বাজেটে কিছু শুল্ক ও কর সুবিধাকে স্বাগত জানালেও তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে-শিল্পখাতের চাহিদা এখনো পূরণ হয়নি।

চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক উল্লেখ করেন, অনেক কাঁচামালের ডিউটি আরও কমানো প্রয়োজন। অর্থাৎ, ঘোষিত সুবিধাগুলো উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়-এমন ধারণা ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে।

এছাড়া শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কমানো হলেও ব্যবসায়ীরা এখনো রিফান্ড বাস্তবায়ন নিয়ে অপেক্ষায়। অতীতে কর ফেরত পাওয়ার জটিলতা থাকায় ব্যবসায়ীরা বাস্তব সুবিধা নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত নন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ও সুদ ভর্তুকির ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কতটা সহজে এ অর্থায়ন পাবেন, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষণা আছে, নিশ্চয়তা কম : চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট আবিদা সুলতানার প্রতিক্রিয়ায়ও একই ধরনের দ্বৈত চিত্র উঠে এসেছে।

সংগঠনটি নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধিকে ইতিবাচক বললেও স্পষ্টভাবে বলেছে-উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থায়নের জটিলতা এখনো নারী উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বাধা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু কর ছাড় দিয়ে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্ভব নয়; প্রয়োজন স্বল্পসুদে ঋণ, জামানতবিহীন অর্থায়ন, আলাদা তহবিল এবং সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা।

সংগঠনটি আরও দাবি করেছে-প্রতিটি জেলায় নারী ব্যবসা সহায়তা কেন্দ্র, নারী উদ্যোক্তা ইনকিউবেশন সেন্টার এবং উদ্ভাবনী তহবিল গঠন ছাড়া ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

অবকাঠামো ঘোষণা বনাম বাস্তব অগ্রগতি : চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন, এক্সপ্রেসওয়ে, রেল করিডোর, অর্থনৈতিক অঞ্চল-এসব প্রকল্পকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের বক্তব্যেই পরিষ্কার, শুধু ঘোষণা নয়-বাস্তবায়নের গতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প ঘোষণার পর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

প্রশংসার ভেতরে সতর্কবার্তা : সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-তারা প্রকাশ্যে বাজেটকে স্বাগত।