বিগত আওয়ামী শাসনামলে দেশের সকল সেক্টরে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো। যার নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলো অর্থনৈতিক সেক্টরও। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছিলো। সে সময়ে রিজার্ভ চুরির মত চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছিলো আমাদের দেশে। যা ছিলো বিশ্ব ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক ও নজীরবিহীন ঘটনা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি রীতিমত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এসে ঠেকেছিলো। তবে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রিজার্ভ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন হতে শুরু করে। সে পরিবর্তনের ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বিপ্লব-পূর্ব আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকে মোট রিজার্ভ ছিল ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার। বিপ্লবোত্তর মাত্র কয়েক দিনের অস্থিরতা ও সহিংসতায় রিজার্ভ আরও কমে এসেছিলো। ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রদত্ত এক তথ্যে জানা যায়, সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছিলো। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছিলো, তখন ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। যা ছিলো জাতীয় অর্থনীতির জন্য সত্যিই উদ্বেগজনক।

বিষয়টি এমনই প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলেছিলো, রিজার্ভ নিয়ে কোনো তথ্য দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। রিজার্ভের ব্যাপারে এ মুহূর্তে কিছু জানানো সম্ভব না। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালকের বক্তব্য ছিলো আরো চমকপ্রদ ও উদ্বেগজনক। সূত্রমতে, সে সময় ব্যাংকে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের মতো। এত বিশাল অর্থনীতি সামাল দেয়ার জন্য এ পরিমাণের রিজার্ভ ছিল অপ্রতুল।

স্মরণযোগ্য যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর ৭ আগস্ট থেকে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে চার ডেপুটি গভর্নর, বিএফআইইউ প্রধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। ফলে রিজার্ভ পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি হতে শুরু করে। বিদায়ের সময় অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন মার্কন ডলার রেখে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার সংশ্লিষ্টরা জানান, এ রিজার্ভ দিয়ে দেশের ছয় মাসের খাদ্য আমদানির সক্ষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য রীতিমত সুখবর বলা যায়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইতিবাচক পরিবর্তন হতে শুরু করে। তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বড় ধরনের উন্নতি ঘটেছে সম্প্রতি। সে ধারাবাহিকতায় বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন বা ৩৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। গত ১৬ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের যুগ্ম পরিচালক গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যা দেশের অর্থনীতিতে মাইল ফলক হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৯৬৬ দশমিক ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর আগে গত ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৫৪৬ দশমিক ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩১ হাজার ৯০৭ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার। নিট রিজার্ভ গণনা করা হয় আইএমএফের বিপিএম-৬ পরিমাপ অনুসারে। মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বিয়োগ করলে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যায়।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের প্রথম ১৪ দিনে দেশে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এসেছে ১৫৪ কোটি ২০ লাখ (১ দশমিক ৫৪২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি। এরমধ্যে শুধু ১৪ জুলাই একদিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১১ কোটি ৫০ লাখ (১১৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার সাথে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। যা সম্ভব হয়েছে জাতীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা কমে আসার কারণে। জুলাই বিপ্লবের পর দেশে কোন সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলন নেই। রাজনীতিতে মোটামোটি স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এমতাবস্থায় রেমিট্যান্স আহরণ ও বৈদেশিক মুদ্রার মন্দাভাব অনেকটা কেটে গেছে।

বর্তমানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত নেই। অবশ্য সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটা তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে। তাই আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারকে বিরোধী দলের সাথে দূরত্ব কমাতে হবে। একই সাথে গণরায়ের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নিতে হবে কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তাহলেই রিজার্ভে ঊর্ধ্বগতিসহ জাতীয় অর্থনীতি ফিরে আসবে ইতিবাচক ধারায়। দেশের মানুষ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।