মুসফিকা আনজুম নাবা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে সবকিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। সবকিছুতে এসেছে পরিবর্তন। মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে গতিশীলতা। যা আগে কষ্টসাধ্য ছিলো তা এখন অনেকটা সহজসাধ্য হয়ে গেছে। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে কেনাকাটায়ও। উল্লেখ্য, অতীতে আমাদের কেনাকাটার পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আলাদা ছিলো। তখন প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ছোঁয়া ছিলো না। মানুষ সরাসরি হাটে-বাজারে যেয়ে কেনাকাটা করতেন। বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে সাপ্তাহিক হাট বসত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ গ্রাম্য হাট থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিয়ে যেতেন। বিক্রেতারাও বসাতো নানাবিধ পসরা। এছাড়া ফেরিওয়ালা মাথায় করে চুড়ি, ফিতা, শাড়ি, হাঁড়ি-পাতিল, বাচ্চাদের খেলনাসহ নানান সমাগ্রিক নিয়ে আসতেন। এখনও এসবের দেখা গেলেও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগুচ্ছে। মূলত, প্রযুক্তির বদৌলতে কেনাকাটা পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে মানুষ সরাসরি যাচাই বাচাই করে জিনিস-পত্র কেনাবেচা করতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে এখন বর্তমান প্রজন্মে অনলাইন কেনাকেনা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ত জীবনে ই-শপিং প্লাটফর্মগুলো বেশ স্বস্তিদায়ক। ফেসবুকভিত্তিক পেজ কিংবা ওয়েবসাইট থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন । ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন বিক্রয় শুরু করেছেন।
অপরদিকে নতুন নতুন উদ্যোগতা তৈরী হয়েছেন। আগে অনেক জিনিস দুর্লভ বা স্থান বিশেষে পাওয়া গেলেও এখন ঘরে বসেই পাওয়া যাচ্ছে খুব সহজেই। অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে। বহির্বিশ্ব থেকেও পণ্য অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় করার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ই-শপিং অনেক সহজ অন্যদিকে সরাসরি কেনাকেনাটায় খানিকটা ভোগান্তি পোহাতে হয়। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় ই-শপিং আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে। চাল, ডাল থেকে শুরু করে যাপিত জীবনের সবকিছুই পাওয়া যায়। কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই। ক্যাশ অন ডেলিভারী অর্থাৎ পণ্য হাতে পেয়ে তারপর দাম পরিশোধেরও সুযোগ রয়েছে। অনলাইনে সময় বাঁচে, ক্ষেত্র বিশেষে ক্রয়মূল্য হাতের নাগালে থাকে। এককথায় বলা যায়, মার্কেট আমাদের হাতের মুঠোয়। ই-শপিং-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ওয়েবসাইটগুলো প্রায়ই ক্রেতাদের অর্থ সাশ্রয় করতে প্রায়ই গ্রাহকদের বিভিন্ন অফার, ডিল বা কুপন, রির্টান পারসেলসহ নানান সুবিধা প্রদান করেন। ফলে ভিড় ঠেলে ঈদের কেনাকাটা করার বদলে, ঘরে বসেই অনেকে ই-শপিং করার সুযোগ রয়েছে। পছন্দ মতো পণ্য হাতের কয়েক ক্লিকেই ঘরে বসে পাওয়া যাচ্ছে।
হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে কেনাকাটার জন্য দোকানে যেতে হচ্ছে না বরং অনায়াসেই সবকিছু কেনাকাটা করা যাচ্ছে। চাইলেই ব্যস্ততার মধ্যে এক ফাঁকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে ফেলা যায়। বর্তমানে অনলাইন মাধ্যমগুলো আরো বেশি উন্নত ঝামেলাবিহীন। মূল্য পরিশোধেরও তেমন ঝামেলা নেই। ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে সহজেই মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব। শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য থাকছে অনলাইন শপিংগুলোতে। ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছাড়াও আপনার ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র থেকে শুরু করে যেকোনো জিনিস যেমন- মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে ম্বোাইল, ল্যাপটপ, টিভি, ফ্রিজ, গাড়ি, শাড়ি, থ্রিপিছ, টুপি, আতর, জায়নামাজ, বইসহ আরো অনেক কিছু।
অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান বাজারে বেকারত্বের হার বেশি। কিন্তু ই-শপিং এর মাধ্যমে বেকারত্বও দূর হচ্ছে। অনলাইন অঙ্গনে ব্যবসার মাধ্যমে ক্যারিয়ার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ ফেসবুকে পেজ বা গ্রুপ খুলে ব্যবসা করছেন। আবার কেউ কেউ বড় পরিসরে নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী তথ্য দেশে অনলাইন শপের সংখ্যা বেড়ে এখন প্রায় দুই হাজারেরও বেশি এবং অনলাইনে শপিং করা মানুষের আনুমানিক সংখ্যা ১৩ লাখের মতো। এর লেনদেন পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা প্রায়। সর্বোপরি ই-শপিং সময়, প্রোডাক্টেও বৈচিত্রতা, রির্টান পলিসি, পণ্য সম্পর্কে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন বিধায় দিনদিনকে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু অনলাইন শপিং এ যেমন সুবিধা রয়েছে। অপরদিকে এর বিড়ম্ভবনাও একেবারে কম নয়।
এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা পণ্যের মান যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না বরং বিপণনকারীরা যা পরিবেশন করেন তা-ই গ্রহণ করতে হয়। কারণ প্রর্দশনীতে সুন্দর ও আকষর্ণীয় দেখালেও বাস্তবে দেখা যায় ভিন্নচিত্র। ফটোশপের মাধ্যমে পণ্যের ছবি তৈরী, ক্যামেরা কারসাজিতে পণ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে সর্তকতা অবলম্বন করলে এ ধরনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ই-শপিং আড়ালে প্রতারণার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। মূলত, অনলাইনে কেনাকাটার করার সংশ্লিষ্ট ক্রেতা পণ্যের মান যাচাই-বাছাই বা পরীক্ষা করতে পারেন না। এটি এটি ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়।
মূলত, সর্বাধুনিকতা মানবসভ্যতাকে বিকশিত করেছে। সবকিছুর পালে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। আধুনিকতা মানুষের জীবনযাত্রাকে গতিশীল করেছে। আর সে পরিবর্তনের ছোঁয়া আছড়ে পড়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর। যুক্ত হয়েছে অনলাইন পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয়। ফলে বাজার ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং কেনাকাটা সহজসাধ্য হলেও এক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত বিড়ম্ববনাও কম নয়। সাম্প্রতি সময়ে অনলাইন কেনাকাটা অনেকটা জনপ্রিয়তা পেলেও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ির কারণে তা মোটেই বিতর্কমুক্ত হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। ফলে প্রযুক্তির এ কল্যাণমুখী কার্যক্রম কোন কোন ক্ষেত্রে বিতর্কিত হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তাহলেই অনলাইন ব্যবসা অধিকতর জনপ্রিয় ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফুড এন্ড নিউট্রিশন, কলেজ অব হোম ইকনোমিকস।