রাজনীতির সম্পর্কগুলো নদীর মতো, কখনো পাশাপাশি বয়ে চলে, কখনো দূরে সরে যায়, আবার কখনো কোনো এক বাঁকে এসে নতুন এক মোহনায় মিলিত হয়। যে হাত একদিন যৌথ সংগ্রামের মিছিলে পরষ্পরকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল, সময়ের আবর্তে সেই হাতই আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই রূঢ় বাস্তবতার কারণেই রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু কিংবা স্থায়ী শত্রুর চেয়ে স্থায়ী স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থান মুখ্য হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাক্টনের সেই অমোঘ উক্তি- ‘‘ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর পরম ক্ষমতা মানুষকে করে তোলে চরম স্বৈরাচারী’’- আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র বিশ্লেষণে সমান প্রাসঙ্গিক। এদেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত নিয়ম হলো, যিনি বিরোধী দলে থাকেন, তিনি সারাক্ষণ গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর সহনশীলতার বয়ান তৈরি করেন। কিন্তু ক্ষমতার মসনদে বসার পরপরই সেই চেনা সুর উবে যায়। অর্থাৎ দলগুলো তখন গণতন্ত্রের মৌলিক ভাষাই ভুলে যায়। ক্ষমতার এই চিরন্তন মনস্তত্ত্বই অভ্যন্তরীণ দলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করে। ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ ভিন্ন মত ও ভিন্ন আদর্শের দলগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে আসে; তৈরি হয় এক ধরনের সখ্যতা। তবে ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তনের আভাস বা সুযোগ পেলেই সেই সম্পর্কে চির ধরে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক প্রেক্ষপটে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার টানাপোড়েন সেই পুরোনো সত্যটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশানের অবসান ঘটলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র এক নতুন যাত্রা শুরু করে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সেই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়। এই সমর্থনের মধ্য দিয়ে কেবল একটি সরকারই গঠিত হয়নি, বরং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথও সুগম হয়। কিন্তু বিএনপি সহযোগিতার সোনালী অতীত ভুলে যায়। কিছু পরগাছা মানুষের উসকানিতে বিএনপি সরকার ১৯৯২ সালের ২৪ মার্চ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর ভাষা সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আজমকে ‘বিদেশি নাগরিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের ২২ এপ্রিল মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এবং ১৯৯৪ সালের ২২ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে অধ্যাপক গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বহাল রাখেন। অধ্যাপক গোলাম আজমের নাগরিকত্ব ও গ্রেপ্তার ইস্যু এবং পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নে দুই দলের মধ্যকার নীতিগত মতবিরোধের জেরে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সম্পর্কের ফাটল দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ক্ষমতার বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ এই রাজনৈতিক দূরত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণকে লুফে নিতে এক মুহূর্তও ভুল করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর সাথে আওয়ামী লীগ ঐকমত্য পোষণ করে যুগপৎ আন্দোলনে শামিল হয়। ফলে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়তে ইসলামীর দূরত্বের সরাসরি রাজনৈতিক সুবিধা পায় আওয়ামী লীগ।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, সেদিন যদি বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা মোতাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আগেই মেনে নিয়ে একসাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতো, তবে আওয়ামী লীগ নয়, বরং বিএনপিই আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতো। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সেই সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন পেয়েছিল এবং বিএনপি পেয়েছিল ১১৬টি আসন। এই নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াতে ইসলামী মাত্র ৩টি আসনে জয়লাভ করে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তারা ৩টি আসন পেলেও এককভাবে সারা দেশে ৮.৬২% ভোট পেয়েছিল। জামায়াত বিপুল সংখ্যক আসনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হেরে দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে ছিল। ভোটের এই সরল অঙ্কই বলে দেয়, সেদিন দুই দলের ভোট যদি এক বাক্সে পড়তো, তবে নির্বাচনী ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে বাধ্য ছিল এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে সরকার গঠন করা অসম্ভব হতো। কিন্তু একটি আত্মঘাতী ভুলের খেসারত হিসেবে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার স্বাদ পায়। আর ক্ষমতার এই পটপরিবর্তনের পরপরই তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী মতের ওপর নেমে আসে দমন-পীড়নের এক নতুন অধ্যায়। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আরও বেগবান করার প্রয়াসে ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চারদলীয় জোট’ গঠিত হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোট বিপুল আসনে জয়ী হয় এবং আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। চারদলীয় জোট যৌথভাবে সরকার গঠন করে। সেই সরকারে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃশ্যত কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারির দাগ লাগেনি; বরং জামায়াতের এই দুই মন্ত্রীর সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা আজ এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতার বিশাল দাপট সত্ত্বেও যেখানে শরিক দলের মন্ত্রীরা শতভাগ সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন, সেখানে প্রধান দল হিসেবে বিএনপি কেন নিজেদের নেতাকর্মীদের এমন নিষ্কলুষ ও সৎ নেতৃত্ব উপহার দিতে ব্যর্থ হলো? একটি আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে সৎ মানুষ ও কলঙ্কমুক্ত নেৃতত্ব ছাড়া দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এই মহাসত্যটি তৎকালীন সময়ে চরমভাবে অবহেলিত হয়েছিল। এরপর রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনী সমীকরণকে আরও বিস্তৃত করতে ২০১২ সালে চারদলীয় জোটের পরিধি বাড়িয়ে প্রথমে ১৮ দলীয় জোট এবং পরবর্তীতে ২০ দলীয় জোটে রূপান্তর করা হয়। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বিএনপির প্রধান সহযোগী দল ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কৌশলগত কারণে ২০২২ সালে বিএনপি ২০ দলীয় জোট বিলুপ্ত ঘোষণা দিলে দীর্ঘদিনের সেই আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের অবসান ঘটে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময় দলটি একচেটিয়াভাবে রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা দখল করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগের এই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর মজবুত ঐক্যের ভিত গড়ে তুলতে না পারা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার নানামুখী দূরত্ব আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল। ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশে আইনের শাসন, সুশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও রাষ্ট্র সংষ্কারের মতো বিষয়গুলোতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও ক্রমবর্ধমান দূরত্ব সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের জামায়াতে ইসলামী বিরোধী বক্তব্য আওয়ামী লীগের পুরোনো বক্তব্যগুলোকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিগত দেড় দশক ধরে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ যেভাবে ’৭১ ইস্যু নিয়ে, স্বাধীনতাবিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে নেয়ার চেষ্টা করেছিল, ঠিক একই কায়দায় বিএনপি জামায়াত বিদ্বেষী মনোভাব দৃশ্যমান করে আত্মঘাতী পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। অথচ দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে যে জামায়াতের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, গলাগলি করে মাঠে রাজনীতি করল, আজ তারাই আবার ক্ষমতার নতুন সমীকরণে এসে সেই জামায়াতকেই নতুন করে ‘রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধী ট্যাগ দিয়ে মাঠে-ময়দানে সস্তা বিরোধ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে, যা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।
রাজনীতিতে আদর্শিক মতপার্থক্য থাকবে; এটাই স্বাভাবিক! তবে সুস্থ গণতন্ত্রে ভিন্নমত ও পরমতসহিষ্ণুতাকে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই গণ্য করা হয়। কিন্তু উদ্বেগের মূল কারণ হলো- শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বিরোধ যখন তৃণমূল পর্যায়ে চলে যাবে তখন তা সহিংসতায় রূপ নেবে। কারণ কেন্দ্রীয় নেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সমর্থকেরা অনেক সময় অন্ধভাবে গ্রহণ করে। ফলে গঠনমূলক রাজনৈতিক সমালোচনা ও ব্যক্তিগত বৈরিতা হিংসায় রূপ নেয়। আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের উচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে চালানো এই মনস্তাত্ত্বিক অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা অবিলম্বে বন্ধ করা। এদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার স্বার্থেই দল দুটির হাতে হাত মিলিয়ে চলা জরুরি। কারণ তারা যদি যৌথভাবে দেশ পরিচালনায় একমত হতে পারে তবেই কেবল এদেশের মাটি থেকে স্থায়ীভাবে ফ্যাসিবাদ নির্মূল করা সম্ভব। এর ব্যতিক্রম ঘটলে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দুই বৃহৎ দলের সংঘাতের আগুনে ঝরে যেতে পারে অমূল্য জীবন। সুতরাং একটি পরিপক্ক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির উচিত দেশের প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর সাথে আলোচনায় বসা। নিজেদের মধ্যকার ভুলত্রুটিগুলো শুধরে জনতার রক্তে ভেজা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে আপসহীন ভূমিকা রাখা। যদি সরকার জুলাই সনদের মূল চেতনা ও রাষ্ট্র সংষ্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তবে এদেশের বঞ্চিত মানুষের ভেতরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আবারও দাবানল হয়ে জ¦লে উঠতে পারে।