করাত-কলের গান
নয়ন আহমেদ
কাঠ চেরাইয়ের শব্দে জেগে উঠেছে সকাল।
ত্রিকোণোমিতি–পড়া পৃথিবীর বয়স হয়েছে অনেক।
তবু তার গোলাকার বৃত্তের মতো উপঢৌকন এখনও
অর্জিত হলো না মানুষের।
এইমাত্র, করাত-কলের দাঁতে পিষ্ট হয়ে বৃক্ষ পেলো-কাষ্ঠজনম।
সারি সারি কাঠ প্রস্তুত হচ্ছে পরবর্তী নির্মাণের জন্য।
কেউ গৃহসংযুক্ত বাস্তবতা হবে।
একটা চৌচালা ঘরের সৎ প্রতিবেশী হবে।
কেউ গৃহশোভা-আসবাব। অপরিহার্য অংশগ্রহণ।
এই ফাঁকে করাত-কল ভাবছে-আয়তকার ঔদার্যের ইতিকথা।
কাষ্ঠেরও আছে অন্তর্ভেদী জন্মান্তরবাদ।
মানুষের নেই।
তার গায়ে বড় বেশি লেগে আছে হত্যা ও জিঘাংসার দাগ।
আছে মারণাস্ত্রের মতো ক্রীড়া-অনুষ্ঠান।
আছে চৌবাচ্চার মতো শত্রুতা।
গভীর কূপের মতো ঈর্ষা।
অথচ মাটিরই তৈরি মানুষ।
কিন্তু, জীবনকে শোভা ও মাধুর্যে পূর্ণ করতে
তার তাগিদ নেই কোনো।
করাত-কলের প্রস্তাব- মানুষের জন্য দরকার কঠিন চীবর।
নীরব প্রেমের ছায়া
সাগর আহমেদ
তোমার কানে গোঁজা কাঠগোলাপ হতে চাই,
অথবা শেষরাতের নিঃশব্দ শিউলি-
যা ঝরে পড়ে শুধু তোমার জন্য।
তোমার চোখের গভীরে হারিয়ে যেতে চাই
এক নামহীন নগরীতে,
যেখানে ফেরার কোনো মানচিত্র নেই-
আছে শুধু তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ।
তুমি যে পথে হাঁটো,
সে পথের ঘাসে ঘাসে আমি শিশির হয়ে লেগে থাকি-
অদৃশ্য নীরবতায়,
তোমার পদধ্বনিতে কেঁপে উঠি প্রতিদিন।
তোমার স্পর্শে ফুটব, আবার ঝরে পড়ব তোমারই অবহেলায়-
কবিতার প্রতিটি লাইন হয়ে ওঠে তুমিময়।
তোমার একফোঁটা দীর্ঘশ্বাসে আমি বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ি,
আর সমস্ত না-বলা বিষাদ মিশে যাই ভেজা মাটির গন্ধে।
আকাশ যেমন নিঃসঙ্গ রাতে নক্ষত্রকে আগলে রাখে,
আমি তেমনই তোমাকে রাখি আমার গভীর নীরবতায়-
যেখানে ভালোবাসা শব্দ নয়,
শুধু থেকে যাওয়ার এক অনন্ত অনুভব।
এক পা দূরের দেশে
ইসমাঈল হোসাইন মুফিজী
সেদিনের সেই সফরের গন্তব্য ছিলো হিলি-
ট্রেন থেকে নামতেই চোখে পড়লো সীমান্তের চিহ্ন
কোনো কাঁটাতার কিংবা সুউচ্চ দেয়াল নয়,
যেন মরিচ ক্ষেতের এক চিলতে অস্থায়ী বেড়া।
ওপার থেকে ভেসে আসে চেনা আজানের সুর:
‘এসো নামাজের দিকে, এসো সফলতার দিকে।’
একই আকাশ, একই ভাষা, একই বিশ্বাসের ডাক
অথচ মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে পাসপোর্ট-ভিসার প্রহরা;
তাই চোখে চোখ রাখা ছাড়া,
আর কোনো সম্পর্কের অনুমতি নেই এখানে।
অর্ণবপোত
বশির আহমেদ
কিছু মানুষ রাইনাইটিসের মতো,
অন্যের মনস্তাত্ত্বিক আকাক্সক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
পত্রঝরা দৃশ্যাবলীর মতো নড়বড়ে
প্রতিরোধ ক্ষমতা
শিকড়হীন বৃক্ষের মতো!
ঝড়ের কবলে ফুসে উঠে নদী,
একমাত্র ঢেউ ভাঙ্গা অর্ণবপোত
খুঁজে পায় তটের আনন্দ।
রক্তভেজা গোলাপ
হাসান মাহমুদ
রক্ত ভেজা গোলাপ-
যেন ভালোবাসার শেষ চিঠি,
যেখানে লাল রঙে লেখা আছে
অপূরণীয় ব্যথার ইতিহাস।
তার পাপড়িতে জমে আছে
নীরবে পাওয়া কষ্টগুলি,
সুগন্ধে মিশে আছে
হারিয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতির স্মৃতি।
কেউ দেখে শুধু সুন্দর,
কেউ সুগন্ধীর ঘ্রাণ নেয়
আর কেউ খুঁজে পায়-
দহনে পোড়া ক্ষতচিহ্ন।
দুঃখটা থেকে যাক
মোহাম্মদ ইসমাইল
সারা শরীরে এখনো সেই পুরানো ব্যথা
জীবনের সেই অনাবৃত দুঃখ কথা
কথাগুলো -
মনেহয় এখনো বুঝি সে খুব অগোছালো।
জীবনের একটি অন্যরকম দুঃখ হয়ে
অদ্ভুত কোনো নদী হয়ে -
যাচ্ছে দূরের কোনো সাগরে হারিয়ে!
গগনবিদারী অট্টহাসি দিয়ে
দুঃখটা তাই থেকে যাক - মোনাজাতের অশ্রু হয়ে!
ভগ্ন হৃদয়
মুসাফির জিয়া
কেউই
কোনোদিন আমার আপন ছিল না
না চৈত্রের খরায়,
না বাসন্তী ভালোলাগায়
যদিও মায়াবী সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ স্বপ্নরা
ভীষণ রুপসী ছিল।
কিছু কিছু হৃদয় শুধু
একলাই রয়ে যায় ;
কিছু কিছু সম্পর্ক শুধু
অকারণেই ভেঙে যায় !