আল-জাজিরা, রয়টার্স, তাস, ইউএন নিউজ : সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ায় ইউক্রেনের হামলা বেড়ে যাওয়ায় মস্কোর অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বলে স্বীকার করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার অবকাঠামোর ওপর কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেনের হামলা তীব্র হওয়ার পর গত শুক্রবার এমন মন্তব্য করেছেন পুতিন। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাশিয়ার নিজনেকামস্ক শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে হামলার দায়ও কিয়েভ স্বীকার করেছে।

রাশিয়ার ভেতরে তেল শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও পাইপলাইন নিশানা করে হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেন। এ স্থাপনাগুলো রাশিয়ার লাভজনক তেল ও গ্যাস রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ও পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে মস্কোর অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ায়, এসব হামলার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে গতকাল প্রেসিডেন্ট পুতিন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, এ হামলাগুলো ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মস্কোর সংকল্পকে দুর্বল করতে পারবে না।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রকাশিত মন্তব্যে পুতিন বলেন, ‘অর্থনীতির বিষয়ে বলতে গেলে, তারা অবশ্যই আমাদের কিছু ক্ষতি করছে। তবে আমরা খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, এসব হামলার উদ্দেশ্য হলো রুশ সমাজের মধ্যে ‘বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি করা’। তবে পুতিনের দাবি, এই হামলাগুলো সমাজকে বিভক্ত করতে পারবে না। ইউক্রেন রাশিয়ার অর্থনীতির যতটুকু ক্ষতি করতে চায়, ততটুকু তারা করতে সফল হবে না। পুতিন মনে করেন, ইউক্রেনের লক্ষ্য পূরণ হবে না এবং রাশিয়া এসব চাপ মোকাবিলা করতে পারবে। রাশিয়ার ভেতরে ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ সামনে এলেও দেশটির তথাকথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ সফলভাবেই এগিয়ে চলছে—এমন সরকারি বয়ান বজায় রাখার চেষ্টা করছেন পুতিন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রুশ বাহিনী শত্রুপক্ষের অবকাঠামোর ওপর হামলা আরও জোরদার করবে।

রুশ নেতা আরও বলেছেন, মস্কোকে তার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। চলতি মাসে এ নিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো এমন আহ্বান জানিয়েছেন। রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলার পাশাপাশি ইউক্রেন রুশ-অধিকৃত ক্রিমিয়ার সরবরাহব্যবস্থাও হামলার নিশানা করছে। এর মধ্যে জ্বালানিবাহী ট্রাকের ওপর হামলার ঘটনা আছে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়ার পর এবার ক্রিমিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা এবং ক্রিমিয়া ও অন্য রুশ-অধিকৃত অঞ্চলে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করার অভিযান যুদ্ধক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান শক্তিশালী করছে এবং বেশি কার্যকর প্রভাব ফেলছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার বলেছে, ‘একদিকে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদিত জ্বালানি গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে রাশিয়ার জ্বালানি খাত দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ছে।’ ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ চলতি সপ্তাহের শুরুতে ক্রিমিয়ার জ্বালানিসংকটের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি পুতিন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ওলেকসান্দর সিরস্কি দাবি করেছেন, মে মাসে ইউক্রেন যতটা ভূখণ্ড হারিয়েছে, তার চেয়ে বেশি এলাকা পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে কয়েক মাস ধরে রাশিয়ার যে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছিল, তা থমকে গেছে।

ইউক্রেনে মে মাসে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা:

গত চার বছরের মধ্যে ইউক্রেনে চলতি বছরের মে মাসে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, মে মাসে অন্তত ২৭৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৭৬৩ জন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের এপ্রিলের পর এটিই এক মাসে সর্বোচ্চ বেসামরিক হতাহতের ঘটনা। ২০২৫ সালের মে মাসের তুলনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা প্রায় ৯৩ শতাংশ বেড়েছে। ওই সময় ১৯১ জন নিহত এবং ৮৬৫ জন আহত হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।

জাতিসংঘ জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে মোট হতাহতের প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘটেছে। এসব হামলার বড় অংশ রাজধানী কিয়েভ ও দনিপ্রোর মতো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরের শহরগুলোতে হয়েছে। অন্যদিকে সামনের সারির যুদ্ধাঞ্চলে স্বল্প-পাল্লার ড্রোন হামলা বেসামরিক হতাহতের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। শুধু মে মাসেই ড্রোন হামলায় ৬৪ জন নিহত এবং ৫৩৯ জন আহত হয়েছেন, যা যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।