নিখোঁজ ৫০ হাজার

সংগ্রাম ডেস্ক:

ভেনিজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে এক শতকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে বহু ভবন ধ্বংসস্তূপে রূপ নিয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিখোঁজের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। শত শত মানুষ এখনও ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে রয়েছে। উত্তর ভেনেজুয়েলাজুড়ে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

দেশটির সরকারের দেওয়া তথ্যে এসব কথা বলা হয়েছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, এই দুর্যোগে অন্তত ৩ হাজার ৩৬০ জন আহত হয়েছেন। ১৭২ জনেরও বেশি মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। নিখোঁজের সংখ্যা এরই মধ্যে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লোকজনকে উদ্ধারে ধীরগতির উদ্ধারকাজের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ভাই ও দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জন হয়েছে। এর আগে ডেলসি রদ্রিগেজ ভূমিকম্পে প্রায় ৩ হাজার মানুষ আহত হওয়ার তথ্য দেন। ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা স্টেট পরিদর্শনকালে তিনি জানান, বিদেশী উদ্ধারকারী দলগুলো সেখানে পৌঁছাতে শুরু করেছে। উদ্ধারকারী দলগুলো পৌঁছালেও মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিবিসি, এপি, রয়টার্স, আল-জাজিরা

রদ্রিগেজ আরো বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে লা গুয়াইরা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারী দল জীবিতদের সন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও পানিও বিতরণ করছে ক্ষতিগ্রস্তদের। হাজারো মানুষ নিখোঁজ হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং ব্যাপক উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো কয়েক ডজন মানুষকে উদ্ধার করে তাদের পরিবার ও প্রিয়জনদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই অভিব্যক্তি প্রকাশ করে উদ্ধার কর্মীরা প্রেসিডেন্টকে বলেছেন, এটা আমাদের আনন্দ দেয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে ভেনিজুয়েলার প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যাদের মধ্যে শুধু কারাকাসেই প্রায় ২০ লাখ মানুষ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের আমেরিকা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক লয়েস পেস বলেছেন, মানুষ এখনো তাদের বাড়িতে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। এদিকে বুধবারের এ ভয়াবহ ভূমিকম্প নিয়ে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) আশঙ্কা, নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির কারণে রাজধানী কারাকাসের সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ধ্বংসস্তূপের পাশে স্বজনদের অপেক্ষা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে ল-ভ- অবস্থায় পড়েছে ভেনিজুয়েলা। যেকোনো বড় ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা সুবর্ণ সময়। ভেনিজুয়েলায় গত ২৪ জুন ভূমিকম্পটি হওয়ার পর সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে গেছে। সময় ফুরিয়ে আসায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া স্বজনদের খোঁজে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন হাজারো মানুষ।ভূমিকম্পে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানী কারাকাসের ঠিক উত্তরের এই রাজ্যটি এখন আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসস্তূপের পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। সেখানে নিখোঁজদের স্বজনরা প্রিয়জনদের জীবিত ফেরাতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। অনেক জায়গায় সরকারি উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা হাতুড়ি, ড্রিল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র দিয়ে কংক্রিটের বিশাল স্ল্যাব কাটার চেষ্টা করছেন। তাদের বিশ্বাস, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো জীবিত মানুষ আটকে আছেন।

ওখানে এখনও মানুষ জীবিত আছে’

লা গুয়াইরায় দেখা গেছে, হাতুড়ি আর পাওয়ার টুল দিয়ে কংক্রিটের বিশাল স্ল্যাব ভাঙার চেষ্টা করছেন অনেকে। সেই শব্দের ভেতরেই ভেসে আসছে স্বজনদের কান্না। এমনই এক ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন নাজারেথ জিমেনেজ। তিনি অসহায় কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ হে ঈশ্বর, আমরা ওদের ওখান থেকে কীভাবে বের করব?’নাজারেথ জিমেনেজ জানান, তার ভাইবোন, ভাইয়ের ছেলে-মেয়ে এবং বন্ধুরা কংক্রিটের নিচে আটকে আছেন। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ভারী যন্ত্রপাতি ও কংক্রিট সরানোর আধুনিক সরঞ্জাম মিলছে না। বিশ্ববাসীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বজুড়ে সরকার ও দেশগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি। ওখানে এখনও মানুষ জীবিত আছে।’ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের ধীরগতিতে মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। লা গুয়াইরার ২৫ বছর বয়সি জেনিফার প্যালাসিওস নামের এক মা জানান, হুগো শ্যাভেজ হাউজিং কমপ্লেক্সের আটটি টাওয়ার ধসে পড়েছে। ওই ভবনে তার ছয় বছরের সন্তানসহ মোট ছয়জন আত্মীয় আটকে আছেন। আকুল কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের চেষ্টায় এ পর্যন্ত কয়েকজনকে জীবিত বের করা গেছে। আমাদের এখন ক্রেন দরকার। কংক্রিটের নিচে এখনো অনেকে বেঁচে আছেন।’

সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে লা গুয়াইরা

এদিকে ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে খাদ্য ও পানি বিতরণ শুরু করেছে সরকারি বাহিনী। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ‘এই সংকটময় মুহূর্তে মানুষকে জীবিত উদ্ধারে সরকার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।’একই সঙ্গে তিনি সারা বিশ্ব থেকে আসা উদ্ধারকারী দল ও মানবিক সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে লা গুয়াইরা রাজ্যকে বর্তমানে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আরও সাহায্য পাঠানো হচ্ছে বলে সরকার জানিয়েছে। তবে দুর্গত বাসিন্দাদের দাবি, যে পরিমাণ সাহায্য আসছে, তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।

উদ্ধার তৎপরতায় জাতিসংঘ

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এই দুটি ভূমিকম্পে প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলার। দুর্যোগ-পরবর্তী এই সংকট মোকাবিলায় ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, এল সালভাদর, কিউবা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশ এবং জাতিসংঘ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, ভারী যন্ত্রপাতি এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো অব্যাহত রেখেছে।