• সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন
  • অনেক বাসা বাড়িতে জ্বালানি চুলা
  • গণপরিবহনের চরম সংকট

কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের একমাত্র ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকা ও তিতাস গ্যাসের আওতাধীন বিস্তীর্ণ এলাকায়। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় গ্যাসের চাপ একেবারে তলানিতে নেমে আসে। কোথাও কোথাও পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে রাজধানীর প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস নিতে পারেননি। এতে নগরজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শিল্প খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, টার্মিনালের ত্রুটি দ্রুত সমাধান না হলে রাজধানীতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, বনশ্রী, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, উত্তরা, শ্যামলী, কল্যাণপুর, ডেমরা, বাসাবো, গেন্ডারিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই চুলায় আগুন জ্বলেনি। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও রান্না করা সম্ভব হয়নি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করেছে। আবার যাদের সেই সুযোগ নেই, তারা বাইরে থেকে খাবার কিনে এনেছেন।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। সকাল থেকে বিভিন্ন স্টেশনের সামনে শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত চাপ না আসায় অনেক স্টেশনে অত্যন্ত ধীরগতিতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। কোথাও কোথাও সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ।

কয়েকটি স্টেশনের সামনে গ্যাস নেই লেখা নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এতে চালকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দেয়। অনেক চালক বলেন, কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস না পাওয়ায় দিনের অর্ধেক সময় নষ্ট হয়েছে। এতে তাদের আয় কমে যাবে। অথচ গাড়ির জমা, কিস্তি ও সংসারের ব্যয় ঠিকই বহন করতে হবে।

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. আবদুল কাদের বলেন, সকাল সাড়ে সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এক স্টেশনে গ্যাস না পেয়ে আরেক স্টেশনে এসেছি। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ট্যাংক ভরতে পারিনি। প্রতিদিনের আয়ের ওপর সংসার চলে। গ্যাস না পেলে রাস্তায় নামব কীভাবে, জমা তুলবই-বা কীভাবে? সিএনজিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন সকালে গ্যাস নিয়ে সারাদিন গাড়ি চালাই। কিন্তু আজ গ্যাসের চাপ এত কম যে লাইনে দাঁড়িয়ে সময়ই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত একটি ট্রিপও দিতে পারিনি। এতে দিনের অর্ধেক আয় কমে যাবে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, ভোর থেকে কয়েকবার চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু আগুনই ধরেনি। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর আগে নাশতা বানাতে পারিনি। পরে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হয়েছে। প্রতিদিন যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য খুবই কষ্টকর হবে।

মিরপুরের ঢাকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক আবদুল মতিন বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। ফলে স্টেশনের বাইরে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। অনেক চালক ক্ষুব্ধ হলেও আমাদের কিছু করার নেই। চাপ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলবে। যেখানে আগে মানুষ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার গ্যাস নিতেন, সেখানে এখন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ৫০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন। গ্যাসের চাপ নেই, তাই আমরা দিতে পারছি না।

আগারগাঁও এলাকার একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক মো. সাইদুর রহমান বলেন, সকালের ব্যস্ত সময়ে সবচেয়ে বেশি গ্যাস বিক্রি হয়। কিন্তু আজ চাপ এত কম ছিল যে কয়েক ঘণ্টা ধরে সীমিত আকারে গ্যাস দিতে হয়েছে। অনেক চালক অপেক্ষা না করে ফিরে গেছেন। এতে চালকদের যেমন ভোগান্তি হচ্ছে, তেমনি আমাদেরও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি জানিয়েছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব তিতাসের আওতাধীন ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় পড়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা দ্রুত মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে পুরোপুরি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের গ্যাসের স্বল্পচাপ কিংবা সাময়িক সরবরাহ বিঘ্নের সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী জানান, টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের কাজ চলছে এবং আগামী দুই দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ওই ঘটনার কারণে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এতে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলো প্রভাবিত হয়েছে। একটি স্থাপনায় সমস্যা হলে যাতে সারা দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা সংকটে না পড়ে, সে জন্য আরও এলএনজি আমদানি অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সংকট নিয়ে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসেনি। আমরা যতটুকু জেনেছি, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না।