বাংলাদেশকে এলডিসি-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।
৯ জুলাই ২০২৬ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স– বাংলাদেশের (আইসিসি বাংলাদেশ) ৩১তম বার্ষিক কাউন্সিল। অনুষ্ঠানে নির্বাহী বোর্ডের পক্ষে সভাপতির বক্তব্যে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, নতুন সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত অগ্রাধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শক্তিশালী প্রবাসী আয়, স্থিতিশীল রপ্তানি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কারণে দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। তবে একই সঙ্গে কিছু অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ এখনও অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব মোকাবিলায় সময়োপযোগী ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। শিল্প খাতের ধীরগতি, কড়াকড়ি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি, জ্বালানি সংকট এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের রপ্তানি স্থিতিশীল ছিল এবং প্রবাসী আয় রেকর্ড ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা বৈদেশিক খাতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে কৃষি ও সেবা খাতও দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যাক্ত করে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, ১৭ কোটির বেশি মানুষের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, উন্নত হতে থাকা অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যম দেশের অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ব্লু ইকোনমি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং পর্যটন খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তিনি বলেন, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দেশীয় রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং বেসরকারি খাতের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত সম্পন্ন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে একটি আধুনিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, এ ধরনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও সহজ হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে, রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। তিনি এ প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর প্রতি আহ্বান জানান।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) ব্যাঘাত, বিভিন্ন দেশের সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে এখনও প্রভাবিত করছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বাজার আরও বৈচিত্র্যময় করা এবং বৈদেশিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সুশাসন নিশ্চিত করা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা থাকলে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলোকে আগামী দিনের সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষে মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি আরও শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সময়োপযোগী সংস্কার, সঠিক অর্থনৈতিক নীতি এবং সব অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম সফল অর্থনীতিতে পরিণত হতে সক্ষম হবে।