গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর তিন মাস অতিবাহিত হয়ে চার মাস চলছে। জাতীয় সংসদেরও একটি অধিবেশন সমাপ্ত হয়ে আরেকটি অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে আজ। তবু এখনো জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট ‘গণভোট’-এর রায় কার্যকর করেনি সরকার। এ নিয়ে গত সংসদে বিশেষ আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয় নিয়ে অধিবেশনের শুরুতেই সংসদ উত্তপ্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা বাজেট অধিবেশন শুরু হবে আজ রোববার বিকেল তিনটায়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বৃহস্পতিবার নতুন অর্থ বছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। বাজেট নিয়ে আলোচনার পর তা পাস হবে। কিন্তু গণভোটে দেয়া জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারে সরকারের তেমন কোন পদক্ষেপ নেই বলে জানা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার কথা বলা হলেও গণভোটের বিষয়ে পরিষ্কার কিছুই বলা হচ্ছে না। তারা মূলত সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। আর এ লক্ষ্যে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করার জন্য গত অধিবেশনে প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য সময় চাওয়া হয়েছে। বিরোধী দলের মূলত চাওয়া হলো, জনগণের অভিপ্রায়কে বাস্তবায়ন করা। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করাই বিরোধী দলের চাওয়া। এ নিয়ে সংসদে একাধিকবার বিতর্ক হয়েছে। সংসদের বাইরে রাজপথেও একাধিক কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সংসদের বাইরেও বিরোধী দলের সাথে সরকারের কোন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি। বিষয়টি সুরাহা না করেই বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে।
সরকারদলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরার আগেই সংবিধান সংশোধনে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। এ বিশেষ কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করার মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কারে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যেখানে বিএনপির সাতজন এবং গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের মধ্যে থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। বিরোধী দল থেকে পাঁচ জনের নাম নিয়ে মোট ১৭ সদস্যের কমিটি করতে চায় সরকার। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে গত অধিবেশনে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলা হয়েছে। ১৭ সদস্যের কমিটিতে বিরোধী দলের মাত্র ৫জন সদস্য থাকলে মূলত সরকারের উদ্দেশ্যই বাস্তবায়ন হবে। এ কমিটির মাধ্যমে বিরোধী দলের চাওয়া অনুযায়ী জনগণের দেয়া গণভোটের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন হবে না। কেননা এ কমিটি সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত হবে। যদি গণভোট বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কারের উদ্দেশ্যে কমিটি করা হয়, তাহলে সেখানে বিরোধী দল অংশ নিয়ে জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করতে পারে।
এ বিষয়ে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনে আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংসদের চিফ হুইপ (নূরুল ইসলাম মনি) আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে এখন মত দিতে পারব না। কারণ আমরা চেয়েছি রিফর্ম (সংস্কার), কিন্তু এখানে হচ্ছে সংশোধন। এই জায়গাটায় আগেও আমাদের মতপার্থক্য ছিল, এখনও এটা রয়েছে। প্রস্তাব ওনারা (সরকারি দল) দিয়েছেন, সেটাকে আমরা নিলাম, শুনলাম। কিন্তু পরে জানাব। এখনই কিছু বলছি না এ ব্যাপারে।’
জানা গেছে, গণভোট বাস্তবায়ন না করলে বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের কমিটিতে নাম দেয়ার পক্ষে নয়। আর সরকার বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়েই কমিটি করতে চায়। বিরোধী দল এ বিষয়ে সংসদে সরকারের পরিষ্কার সিদ্ধান্ত জানতে চাইবে। সরকার যদি সংবিধান সংস্কার করতে না চায় তাহলে বিরোধী দল ওয়াক আউটসহ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আর সরকার তাদের নিজেদের ইশতেহার অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনে কাজ করে যাবে। তবে চলতি অধিবেশনেও এ বিষয়ে সুরাহা নাও হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারে ৩৫টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। মূলত তাদের এসব ইশতিহার বাস্তবায়ন করার জন্য বিরোধী দলের সমর্থন চাচ্ছে। কিন্তু গণভোটের বিষয়ে সরকার ভিন্ন পথেই হাঁটছে। এ বিষয়েই অধিবেশন উত্তপ্ত হতে পারে।