মিয়া হোসেন
নির্বাচনের আগে ইশতিহারে রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। নির্বাচনী প্রচারণায় গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার জন্যও ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু ভোটে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার গড়িমসি করছে। এমন কী সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। যার প্রতিবাদে বিরোধী দল ইতোমধ্যে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপির ইশতিহার ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। “সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগানে নির্বাচনী ইশতিহার-২০২৬ ঘোষণা করা হয়। ভূমিকাসহ পাঁচটি অধ্যায়ে তৈরি করা ইশতিহারের অধিকাংশ জুড়েই ছিল রাষ্ট্রসংস্কারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা। তার মধ্যে প্রথম অধ্যায়ে “৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন” শিরোনামে বলা হয়েছে, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, 'গণতন্ত্রের মাতা' দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং 'জুলাই জাতীয় সনদে' যে সকল বিষয়ে যে অঙ্গীকার ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সেভাবে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে। পরবর্তী পাতায় পৃষ্ঠা ৭ এ “সাংবিধানিক সংস্কার” শিরোনামে সংবিধানের ৩৫টি বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
নির্বাচনের পর সরকারের জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের শপথবিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা গ্রহণ করলেও সরকার দলের সদস্যরা শপথ নেননি। অধিবেশন আহ্বান করার বিধান থাকলে অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। এ নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দফায় দফায় আলোচনা করে প্রস্তাব দেয়া হলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। সর্বশেষ সদ্য সমাপ্ত হওয়া সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ায় এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেছে। সেই সাথে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির জারিকৃত আদেশের মাধ্যমে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আদেশ অনুযায়ীই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ম্যান্ডেট দিয়েছে। এটি সরকারকে অবশ্যই মানতে হবে। আর সংবিধান সংশোধন করলে এটি আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে বাতিল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সংবিধান সংস্কার করা হলে তা আদালত বাতিল করতে পারবে না। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের এসব বক্তব্য আমলে না নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা সংবিধান অনুযায়ী অবৈধ হওয়ায় তারা এটি পালন করতে পারছেন না।
সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি
গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সংসদ। কমিটির সদস্যরা হলেনÑবিএনপির সংসদ চিফ হুইপ সদস্য নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলিউল্লাহ।
তবে বিরোধী দল এর প্রতিবাদে সেদিন সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেছে। সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এ কমিটি ১৭ সদস্যের হওয়ার কথা ছিল। এতে পাঁচজনের নাম দিতে বিরোধী দলকে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছে।
চিফ হুইপ সংসদকে জানান, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করা হলেও তাঁরা কোনো সদস্যের নাম দেননি। তাই আপাতত পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
চিফ হুইপ এই প্রস্তাবটি করার পর বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান বলেন, এ বিষয়টা সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই চলে আসছে। প্রথম অধিবেশনেই এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সে দিনই বিরোধী দল অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
চিফ হুইপ একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাঁরা কখনোই বলেননি এ কমিটিতে নাম দেবেন। তাঁরা জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তাঁরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন। ওইটাকে যদি বাইপাস করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের অভিপ্রায় ও মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য বা অপমান করা উচিত নয়। এ জন্য তাদের প্রতি সম্মান রেখেই আমরা শুধু এই কমিটিতে অংশগ্রহণ করবো না এটাই নয়; বরঞ্চ এই পর্বটা আমরা যেহেতু জনগণের রায়কে সম্মান করা হচ্ছে না তার প্রতিবাদে ওয়াক আউট করছি।’
এরপর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি সংসদে পাস হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে, তবে বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে, জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ হয়েছে এবং সেই ভাষণের ওপর সরকার ও বিরোধী দল আলোচনা করেছে। তাই বর্তমান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বিরোধী দলের দুটি শপথের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ, এটি কালারেবল লেজিসলেশন। তিনি বলেন, আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে যদি সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি।
বিরোধের পটভূমি
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা এটিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়, ‘সংবিধান সংস্কার’ করতে চায়।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জাতীয় সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা। তবে বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন।
বিএনপির ইশতিহারে ৩৫ দফা সাংবিধানিক সংস্কার
১. সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ইং তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
২. ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। বিএনপি সকল বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও বিষয়াবলী পর্যালোচনা ও পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে। রাষ্ট্র কাঠামোয় গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার সাধন করা হবে।
৩. বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতিফলিত রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি 'নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার' ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি। উল্লেখ্য, বিএনপি সরকারের সময়ই সংসদে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল যা ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে বাতিল করা হয়।
৪. একজন উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃজন করা হবে এবং তিনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচিত হবেন।
৫. একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে তার মেয়াদ যা-ই হোক না কেন, তিনি সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছর অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ব্যক্তি একই সাথে দলীয় প্রধানের পদেও অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন।
৬. রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন করা হবে।
৭. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
৮. সংবিধানের এককক্ষীয় চরিত্র অক্ষুণœ রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি উচ্চকক্ষের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সংযোগের লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ আসনবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রণয়ন করা হবে। রাজনৈতিক দলসমূহ নির্বাচনের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে।
৯. আইনসভার উচ্চকক্ষে দুইজন ডেপুটি স্পিকারের মধ্য থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার সরকার দলীয় ব্যতিরেকে অন্যান্য দলসমূহের মধ্য থেকে মনোনীত করা হবে।
১০. নিন্মকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় উচ্চকক্ষের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশের প্রয়োজন হবে না। উচ্চ কক্ষে কমপক্ষে ১০% নারী সদস্য থাকবেন।
১১. আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী বিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত যেমন যুদ্ধ পরিস্থিত) এমন সব বিষয় ব্যতীত অন্যসব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিদানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে।।
১২. সংবিধান সংশোধনী, অর্থবিল, আস্থাভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) ইত্যাদি ছাড়া অন্যসব বিল উচ্চকক্ষে প্রেরণ করা হবে। উচ্চকক্ষ কোন বিল সর্বোচ্চ ১ (এক) মাসের বেশি আটকে রাখলে তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।
১৩. আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সম্পাদিত চুক্তি সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত রাখা হবে।
১৪. দক্ষ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিগ্রাহ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করার লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনয়ন করা হবে।
১৫. সরকারি কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের জন্য এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ (অন্য সকল সেক্টর) নিয়োগের জন্য তিনভাগে শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করা হবে।
১৬. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ আইনানুসারে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন।
১৭. সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দুইজন বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ প্রদানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হবে।
১৮. রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে। তবে, প্রধান বিচারপতি প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
১৯. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অধিকতর শক্তিশালী ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।
২০. অধঃস্তন আদালতে বিচারকদের চাকরি থেকে অপসারণের সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।
২১. আইনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে হাইকোর্টের স্থায়ী প্রসিকিউশন/এটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা হবে।
২২. জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এসব কমিটিতে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বন্টনে প্রাপ্ত আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
২৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সংবিধানে এমন বিধান যুক্ত করা হবে যে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত সাজাপ্রাপ্ত পদের মার্জনা, বিলম্বন ও রেয়াত মঞ্জুর করার এবং দ-াদেশ মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত পর্যবেক্ষক, নীতি ও পদ্ধতির অনুসরণক্রমে তিনি উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
২৪. নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিগণের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকা প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
২৫. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে।
২৬. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক যথাযথ আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।
২৭. পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এবং পুলিশি সেবাকে জনবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে একটি পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে। এদসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি প্রয়োজনীয় সংস্কার/পর্যালোচনার মাধ্যমে যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে।
২৮. একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন করার বিষয়টি সংসদে পর্যালোচনা করে দেখা হবে।
২৯. জুলাই অভ্যুত্থানকালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়নের সাথে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির সাথে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে।
৩০. ঐতিহাসিক জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
৩১. ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বিএনপি আমলেই সৃষ্ট ‘ কর ন্যায়পাল’ পদটি বেশ কার্যকর বলে বিবেচিত হয়েছিল।
৩২. বেসরকারি খাতের দুর্নীতির তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. জাতীয় সংসদের অনুমোদক্রমে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপ"-এ পক্ষভুক্ত করা হবে।
৩৪. আয়কর রিটার্ন প্রাইভেট ডকুমেন্ট হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন অথবা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ যেন আদালতের মাধ্যমে তা তলব করতে পারবে, তার নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।
৩৫. রাজনৈতিক দলের সাথে বিজ্ঞ আইনজীবীদের সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা তাদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার-এ নীতিকে সমুন্নত রাখা হবে।