প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে গুণগত পরিবর্তন আনতে সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর তদারকি এবং সময়োপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।’ গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধান এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী অভিজ্ঞ শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক জানান, সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
তিনি জানান, সভায় শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, কার্যকর পাঠদান, শিক্ষকদের যুগোপযোগী ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ে কর্মরত অভিজ্ঞ শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। তারা শিক্ষাক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে করণীয় বিষয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনেন এবং নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন। পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও জনসেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান এবং শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।
এদিকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের আরও সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জাপানি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, কৃষিশ্রমিক ও গাড়িচালক নিয়োগে উদ্যোগ নেওয়ার জন্যও জাপানের প্রতি আহ্বান জানান। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা উনো ইয়োশিমাসা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ আহ্বান জানান।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ কথা জানান। বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও সুদৃঢ় করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মতো আরও একটি শিল্প পার্ক স্থাপনে জাপান আগ্রহী হলে বাংলাদেশ সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে যৌথভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া বৈঠকে আগামী ১৬ ডিসেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের উদ্বোধন এবং চলমান ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্পের অগ্রগতিসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
জাপানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দেশটির ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলবিষয়ক সহকারী ভাইস মিনিস্টার নাকায়ামা রিয়েকো, জাপানের সিভিল এভিয়েশন ব্যুরোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি।
এদিকে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন প্রস্তুতকারকদের প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই দুটি মেশিন ব্যবহার উপযোগী ও বাজারজাত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি। বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক সভায় তিনি এ আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ কথা জানান।
সভায় সংশ্লিষ্টরা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি চিকিৎসা যন্ত্রের কার্যকারিতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশে সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মান যাচাই এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা দেবে।
আলাদা দুইটি বিশেষজ্ঞ দল ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন তৈরি করেছে বলে সভায় জানানো হয়। সভায় সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এগুলো দেশের সব হাসপাতালে ব্যবহারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা যাবে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় যন্ত্র দুটি তুলনামূলক কম খরচে বাজারজাত করা সম্ভব হবে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই দুটি চিকিৎসা যন্ত্র সফলভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ভেন্টিলেটর মেশিনটি গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম। এ কারণে এর নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
অন্যদিকে হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিনটি শ্বাসতন্ত্রের সাধারণ সমস্যাজনিত রোগীদের জন্য ব্যবহার উপযোগী। এই যন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি বৈদ্যুতিক সংযোগ ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। ফলে বিদ্যুৎ-সুবিধাবঞ্চিত এলাকা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী পরিবহনের সময় অ্যাম্বুলেন্সেও এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে।
সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রো ভিসি ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিকিৎসক সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ ডা. মামুন শিবলীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা মো. সুজনের নবজাতক কন্যা সাইফা নুর সুবহার জন্য উপহার পাঠিয়েছেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের উদ্যোগে সংগঠনটির প্রতিনিধি দল আহত জুলাই যোদ্ধা সুজনের ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসায় যায়।