সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের উদ্যোগে “জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে উলামায়ে কেরামের অবদান শীর্ষক আলোচনা সভা রবিবার (১২ জুলাই) বিকেলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।

তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আ ফ ম খালিদ হাসান। বিশেষ অতিথি ছিলেন তালিমুল কুরআন ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালিম এবং বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার মুফতি কাজী ইব্রাহিম।

সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান এমপি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’র নায়েবে আমীর ও সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সেক্রেটারি ও সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের যুগ্ম-সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম, সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য যথাক্রমে ড. মাওলানা সামিউল হক ফারুকী, ড. মাওলানা আবদুস সামাদ, আ ন ম রশিদ আহমদ মাদানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েমে আমীর আবুল কাসেম কাসেমী, মুসলিম জনতা ঐক্য পরিষদের আমীর মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ, ছারছিনা দরবার শরীফের ছোট হুজুর মাওলানা শাহ মুহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দিকী, উলামা কমিটি ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, উলামা কমিটি ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি ড. মাওলানা মীম আতিকুল্লাহ, সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ ঢাকা জেলা দক্ষিণের উপদেষ্টা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন, উলামা কমিটি ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা শহীদুল্লাহ, তানযীমুল উম্মাহ’র চেয়ারম্যান হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল, ঢাকা জেলা প্রতিনিধি ড. সাইফুল ইসলাম রফিক, খালিদ সাইফুল্লাহ বকশী, মাওলানা লুৎফর রহমান, মুফতি মহিউদ্দিনসহ দেশবরণ্য উলামা মাশায়েখবৃন্দ।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আ ফ ম খালিদ হাসান বলেন, “অগ্নিঝরা জুলাই আন্দোলনে এদেশের আলেম সমাজ যেভাবে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে দেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছে জাতি তা চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে”। তিনি বলেন, শুধু জুলাই আন্দোলনে নয় বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলন সংগ্রামে আলেম সমাজ নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতার স্বাদ গ্রহন করতে পারেনি। কারণ সরকারের দায়িত্ব ছিল অনেক। সরকার সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উপদেষ্টাবৃন্দ রাত-দিন কাজ করেছে। নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যেদিন থাইল্যান্ড থেকে অপারেশন করে দেশে এসেছি সেদিনই জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটের প্রচারণায় সিলেট চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার গণভোটের রায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দিকে হাঁটছে না।

আ ফ ম খালিদ হাসান আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি বর্তমান সরকার বাতিল করে দিয়েছে! তার মধ্যে গুম কমিশন অধ্যাদেশ, দুদক অধ্যাদেশ, মানবাধিকার অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ গুলো বাতিল করা হয়েছে! এমন সব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে যার ফলে সেই পুরোনো সংস্কৃতি বিদ্যমান থাকবে। ফলে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন হবে না। কিন্তু জুলাই চেতনা বিলীন হতে দেওয়া হবে না। জুলাই চেতনা বাস্তবায়নে আমরা ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখবো, ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে এদেশে কুরআনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তালিমুল কুরআন ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, শুধু অগ্নিঝরা দিনগুলোতেই নয় বরং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রতিটি রাতে ঘুমাতে যেতে আলেমগণ চিন্তা করতেন ফজরে মসজিদে যেতে পারবে নাকি ক্রসফায়ারে যেতে হবে! ফ্যাসিবাদী শাসনামলের সেই দিনগুলো ছিল ভয়বাহ এবং দুর্বিষহ। হেফাজত ইসলাম গঠনের প্রেক্ষিত তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের ঈমান, ইসলাম, রাসূল ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি নিয়ে মাঠে কর্মসূচি প্রদান করে। ৪ মে ২০১৩ মতিঝিল শাপলা চত্বরে জাতীয়ভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ করে এবং মাসব্যাপি দেশভিত্তিক কর্মসূচি পালনের পর ঐতিহাসিক ৫ মে শাপলা চত্বরে আবার প্রতিবাদ বিক্ষোভে মিলিত হয়। ঐদিন রাতে হেফাজতের ওপর ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার বর্বরোচিত হামলা পরিচালনা করে। এতে বহু আলেম-ওলামা ও মাদরাসার ছাত্র শাহাদাত বরণ করেন। তৎকালিন হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ অসংখ্য আলেম-ওলামা ও ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেফতার করে রিমাণ্ডে নিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়।

মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, কওমি আলেম ও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর গভীর সর্ম্পক ছিল এবং থাকবে উল্লেখ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, আজকে যারা হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের কথাবার্তায় মনে হয় তারা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর ওপর যেই জুলুম নির্যাতন হয়েছে তা ভুলে যেতে বসেছেন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের মাঝে কোনো বিভেদ নেই, বিচ্ছেদ নেই। আমরা মনে করি- কওমি, আলিয়া সব এক কালেমায় বিশ্বাসী মুসলিম। তাই আমরা কোনো বিভেদ, বিভাজন বা বিচ্ছেদে বিশ্বাসী নই। আমরা সবাই ভাই-ভাই।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে আওয়ামী লীগ কর্তৃক পরিচালিত আলেমদের গণহত্যা মিশনে যারা শাহাদাত বরণ করেছেন জামায়াতে ইসলামী সকল শহীদ পরিবারে আর্থিক সহযোগিতাসহ সার্বিক সহায়তার চেষ্টা করেছে। এছাড়াও যেখানেই আলেম-উলামা আক্রান্ত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামী সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে আলেম-উলামাদের পাশে দাঁড়াতে।

মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের জুলুমের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ, মাওলানা আব্দুস সোবহান, মাওলানা অধ্যক্ষ আব্দুল খালেক মন্ডল এবং জুলুমের শিকার হয়ে দুনিয়া ত্যাগ করেছেন, মুফতি মাওলানা ফজলুল হক আমিনী।

তিনি বলেন, জুলাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে আলেমদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে পরাজিত শক্তি চেষ্টা করছে। এই চেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আজকে সংসদে দাঁড়ি-টুপিওয়ালাদের দেখা যাচ্ছে। আমাদের ঐক্য বজায় থাকলে আগামীতে রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের আলেম-উলামারা নেতৃত্ব দেবে, ইনশাআল্লাহ। তিনি আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ছিল বিভাজনের বিরুদ্ধে, ঐক্যের পক্ষে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন বলেন, এখন থেকে আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দ্বীন কায়েমের জন্য ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখবো। সংসদে আলেম সমাজের যেই প্রতিনিধিবৃন্দ রয়েছেন তারা সংসদে ভূমিকা রাখবেন। আমরা মাঠে-ময়দানে ভূমিকা রাখবো, ইনশাআল্লাহ। দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে এই জমিন থেকে সকল অন্যায়, অনাচার, শোষন, জুলুম-নির্যাতন মুক্ত করে ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।