গাজীপুর মহানগরীর ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় টেলিভিশন সাংবাদিক হোসাইন আলী বাবুর ওপর আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তিনি মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তবে ট্রাফিক পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযুক্ত যুবককে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
গতকাল শনিবার (৬ জুন) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তা ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ভেতরে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
আহত হোসাইন আলী বাবু বেসরকারি টেলিভিশন স্টার নিউজের গাজীপুর প্রতিনিধি। তিনি পরিবারসহ গাজীপুরে বসবাস করেন এবং শ্রীপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত কবির হোসেনের ছেলে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক যুবকের নাম জুয়েল (২৮)। তার বাড়ি নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলায়। কয়েকদিন ধরে তিনি ভবঘুরের মতো চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ঘোরাফেরা করছিলেন।
সাংবাদিক হোসাইন আলী বাবু জানান, অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট ও লাইভ সম্প্রচার শেষে তিনি ট্রাফিক পুলিশ বক্সে বসে ল্যাপটপে সংবাদ সংক্রান্ত কাজ করছিলেন। এ সময় জুয়েল নামের ওই যুবক তার কাছে এসে পরিচয় জানতে চান এবং বিভিন্ন অসংলগ্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। সাংবাদিক বাবু বিষয়টি অস্বীকার করলে ওই যুবক হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পুলিশ বক্সের ভেতরে প্রবেশ করে তার ওপর হামলা চালায়।
তিনি বলেন, 'আমি অফিসের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম এবং সংবাদ সম্পাদনার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ করেই সে আমার ওপর এলোপাতাড়ি হামলা শুরু করে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দ্রুত এগিয়ে না এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।'
ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য তাজ উদ্দিন জানান, পুলিশ বক্সের ভেতর থেকে চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে তিনি দ্রুত সেখানে প্রবেশ করেন। গিয়ে দেখেন এক যুবক সাংবাদিক হোসাইন আলী বাবুকে মারধর করছে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে এনে সাংবাদিককে উদ্ধার করেন। এ সময় হামলাকারীকে থামাতে গিয়ে তিনিও সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হন।
বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ হারুন অর রশিদ বলেন, 'প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, হামলাকারী ও সাংবাদিক কেউ কাউকে পূর্ব থেকে চিনতেন না। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশের ঘটনাও পাওয়া যায়নি। আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে সে অসংলগ্ন ও এলোমেলো কথা বলছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আটক যুবকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তার বোন জানিয়েছেন, জুয়েলের মানসিক সমস্যা রয়েছে এবং গত তিন দিন আগে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ ছিল। এছাড়া তার মা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকলেও সে সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।'
ঘটনার পর গাজীপুরে কর্মরত প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, 'সাংবাদিক হোসাইন আলী বাবুর ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এ হামলা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ নয়, এটি স্বাধীন সংবাদ সংগ্রহ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম চর্চার ওপরও আঘাত। একজন সাংবাদিক সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।'
তারা ট্রাফিক পুলিশ ও থানা পুলিশের তাৎক্ষণিক ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, 'আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করেছেন। এজন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ও থানা পুলিশ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।'
সাংবাদিকরা আরও বলেন, 'আমাদের প্রত্যাশা, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো সাংবাদিক দায়িত্ব পালনকালে এ ধরনের ঘটনার শিকার না হন, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজের সকল স্তরের দায়িত্ব।'
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির সার্বিক বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।