যশোরের শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি, দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হয়েছে।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্দেশনার পর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় এ সিদ্ধান্ত নেয়। জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক আদেশে শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে মো. শাহিন আলমকে অবিলম্বে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে শার্শা উপজেলার গোগা ইউনিয়নের সেতাই গ্রামের ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করার তথ্য উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, দলিল লেখক এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে এ অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
জমির ক্রেতা আফসার আলী জানান, তিনি প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকায় জমিটি কিনলেও পরে জানতে পারেন সেটি সরকারি খাস সম্পত্তি।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে কম মূল্যে দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দলিলে জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে মূল্য কম দেখানো হয়, ফলে সরকার স্ট্যাম্প ডিউটি, নিবন্ধন ফি ও কর বাবদ বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সম্পাদিত তিনটি দলিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় মোট ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বালুন্ডা ও বুরুজবাগান মৌজার কয়েকটি জমির ক্ষেত্রে ডাঙা বা বাগান শ্রেণির জমিকে ধানিজমি কিংবা ডোবা হিসেবে উল্লেখ করে মূল্য কমানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, যদি একটি দিনের কয়েকটি দলিলেই এত বড় অঙ্কের মূল্য গোপন করা হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘ ১৫ মাসে নিবন্ধিত শত শত দলিলের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া গত প্রায় ১৫ মাসে অর্ধশতাধিক সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব জমির বেশিরভাগই সরকারি খতিয়ানের আওতাভুক্ত হলেও বিভিন্ন কৌশলে জাল বা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
দানপত্র, হেবা, ওয়ারিশসূত্রে মালিকানা হস্তান্তর, বিনিময় দলিল ও ভ্রম সংশোধন দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীরাও অসহযোগিতার মুখে পড়েছেন।
মো. শাহিন আলম ২০২৫ সালের ৩ মার্চ ঝিকরগাছা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। একজন কর্মকর্তার হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের দায়িত্ব অর্পণ নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন ওঠে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং উত্থাপিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, সরকারি খাস জমি রাষ্ট্রের সম্পদ। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেবও জানিয়েছেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।